২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৮ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা জমাদিউস-সানি, ১৪৩৯ হিজরী

কেন এই চুল পড়া? আছে কি এর কোন সমাধান?

জানুয়ারি ২৮, ২০১৮, সময় ১০:১৬ অপরাহ্ণ

অকালে চুল পড়ে যাওয়া! যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় অ্যালোপেসিয়া টোটানিস (টাক) বলে। কোন মানুষ চায় না তার অকালে চুল পড়ুক। সে টাক হয়ে যাক। তবে সাম্প্রতিককালে বয়স্ক মানুষ তো বটেই ২০-২৫ বছরের টগবগে যুবকদের ও টাক হয়! এতে শারিরিক সৌন্দর্যে ভাটা পড়ে এবং এই অকালে চুল পড়ে যাওয়াতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন অনেকে।

কেন এই চুল পড়া? কিভাবেই বা এর সমাধান?
অ্যালোপেসিয়া টোটানিস কেন হয়:- মাথার চুল পড়লেই যে আপনি টাক হয়ে যাবেন এমন কোন কথা নেই। যদি গড়ে প্রতিদিন ৫০-১০০ টির উপরে চুল পড়ে । এবং যদি কয়েক সপ্তাহ ধরে চুল এই পরিমানে পড়তে থাকে তা হলে মনে করতে হবে কিছু একটা অসুখ বিসুখ আছে আপনার।

আমাদের চুল ক্যারাটিন নামের এক রকম প্রোটিন দিয়ে তৈরি হয়।

আমাদের চুলে ৯৭ ভাগ প্রোটিন ও ৩ ভাগ পানি রয়েছে। আমাদের চুলের ক্যারাটিন নষ্ট হতে থাকলে চুল শুষ্ক ও ভঙ্গুর হয়ে ওঠে।

আর মূলত সে কারনেই আমাদের চুল পড়তে থাকে। একজন মানুষের মাথায় এক লক্ষাধিক চুল থাকে। প্রতি টি চুল গড়ে ২/৮ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে এবং যখন এই চুল টি মরে যায় তখন সেই জায়গায় আবার নতুন চুল গজায় নির্দিষ্ট চক্রের মাধ্যমে। এই চক্রকে আবার তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়। (১) অ্যানাজেন, (২) ক্যাটাজেন ও (৩) টেলোজেন।

চুল বৃদ্ধির মূল কাজটি হয় অ্যানাজেন পর্যায়ে থেকে যা সাধারণত ২-৬ বছর পর্যন্ত হতে থাকে। সাধারণত আমাদের চুল বৃদ্ধি ১.২৫ সেন্টিমিটার প্রতি মাসে বাড়ে , কিন্তু বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে চুলের এই বৃদ্ধির হার কমতে থাকে। আর প্রতিটি চুল “টেলোজেন” পর্যায়ের পর পড়ে যায় এবং এই পড়ার হার হচ্ছে কমপক্ষে ১০০টি প্রতিদিন।

আমাদের মাথার শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ চুল অ্যানাজেন পর্যায়ে থাকে। আর সাধারণত ১৫% চুল টেলোজেন পর্যায়ে থাকে। ক্যাটাজন খুবই স্বল্পকালীন সময় সাধারণত ২ সপ্তাহ এবং এর পরেই শুরু হয় টেলাজেন প্রক্রিয়া যা ২/৪ মাস পর্যন্ত হয়। টেলোজেন পর্যায়ের পর একটি চুলের গোড়ায় নতুন চুলের আবির্ভাব ঘটে এবং পুরাতন চুলটি পড়ে যায়। এভাবে নতুন চুলটি অ্যানাজেন পর্যায়ে জন্ম নিয়ে জীবন চক্র শুরু করে।

তবে হ্যা, যদি সে সময় কোন কারনে টেলোজেন পর্যায় দীর্ঘতর হয় তা হলে চুল বেশি পড়বে। এ ছাড়া চুলের “ফসিকল” শুকিয়ে গেলে নতুন চুল নাও গজাতে পারে তখনই মাথায় “অ্যালোপেসিয়া” সৃষ্টি হয়। তখন আমাদের চুলের গোড়ায় একটি এনজাইম তৈরি হয়, যার নাম “ফাইভ আলফা রিডাকটেজ”। এই এনজাইম রক্তে অতিবাহিত হরমোন টেস্টস্টেরনকে ডাই হাইপ্রোটেস্টস্টেরনে পরিণত করে। যার আরেক নাম ডিএইচটি।

ডিএইচটি আমাদের চুলের গোড়ায় আক্রমণ চালায় এবং চুল দুর্বল করে ঝরে পড়তে সাহায্য করে। পুরুষদের চুল সাধারণত সামনের দিকে পড়ে এবং টাকে পরিণত হয়। আর মহিলাদের পুরো মাথার চুল পাতলা হয়ে যায় এবং পরে তা ভয়ংকর আকারে পড়তে থাকে।

মহিলাদের শরীরে “অ্যারোমাটেজ” নামে এক প্রকার এনজাইম তৈরি হয় যা ডিএইচটিকে ইস্ট্রোজেনে পরিণত করে।

সাধারনত পুরুষের বেলায় ই বেশির ভাগ সময় টাক দেখা যায় তবে মহিলাদের ও টাক হতে পারে যখন একজন মহিলার বয়স ৩৮/৪৮। তখন ফিমেল হরমোনের পরিমাণ কমে যায় এবং মেল হরমোন বা টেস্টোস্টেরন/এন্ড্রোজেনের আধিক্য বেড়ে যায় ও একই নিয়মে ছেলেদের মত টাক পড়তে পারে। তবে পুরুষের বেলায় একি নিয়মে টাক না ও পড়লে চুল একেবারে পাতলা হয়ে ঝরে যায়।

চুল পড়ার মুল কারনের মধ্যে ৯৫ ভাগ চুল পড়ার কারণ জিনগত বা বংশগত বলতে পারেন যাকে অ্যানড্রোজেনিক অ্যালোপিসিয়া বলা হয়।

বাবা কিংবা মা অথবা দু’জনের কাছ থেকে আগত জিনের মেসিঙ্গের কারনেই মাথার টাক বা চুল পড়ে থাকে , যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় অ্যানড্রোজেনিক অ্যালোপেসিয়া বলা হয় এবং মূলত ইহা অ্যানড্রোজেন (পুরুষদের হরমোন)।

গর্ভবতী অবস্থায় এবং বাচ্চার জন্মের পর হরমোনার ভারসাম্যের পরিবর্তন হয় বলে তখন চুল বেশি পড়ে মহিলাদের। হরমোনের এ পরিবর্তন আবার আগের জায়গায় ফিরে গেলে পুনরায় চুল গজায়।

দুশ্চিন্তায় ভুগলে বা মানসিক সমস্যা থাকলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি করে চুল পড়তে পারে। তবে এ চুল পড়া সাময়িক এবং পুনরায় চুল গজায়। কিন্তু দীর্ঘদিন মানসিক দুশ্চিন্তায় থাকলে বা দুশ্চিন্তা কাটিয়ে উঠতে না পারলে অনেক বেশি চুল পড়ে যেতে পারে।

প্রতিকার এবং চিকিৎসা :- আমাদের মাথায় যত চুল সাম্প্রতিক সময়ে আশপাশে তারচেয়ে বেশি বিভিন্ন “অল্প সময়ে টাক মাথায় চুল গজানো হয়” এইরকম নামের প্রতিষ্টানে ভরপুর। সিংহভাগ প্রতিষ্টানই আপনাকে বোকা বানিয়ে ধোকা দিবে। তাই ভেবে চিনতে এগিয়ে যাবেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা চুল প্রতিস্থাপনই সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা বলে মনে করেন । যা খুবই ব্যয়বহুল পদ্ধতি, তবে কয়েক বছরের জন্য যদি মাথায় টাক না দেখতে চান তা হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে দেশের বাজারে কিছু ঔষধ আছে।
যেমন; মিনোক্সিডিল : এটি বাজারে ১%, ২% ও ৫% মাত্রায় পাওয়া যায়। এটি চুলের ফলিকলের বৃদ্ধিকাল বাড়ায়। তবে এটি শুধু এখন সক্রিয় আছে এমন ফলিকলের ওপর কাজ করে। আর যতদিন এটি ব্যবহার করা হয়, ততদিনই শুধু সুফল পাওয়া যাবে। এই ওষুধটি এক ধরণের লোশন যা সরাসরি মাথার ত্বকে ব্যবহার করতে হয়।

ফিনাস্টেরাইড : মুখের খাবার ওষুধ এটি। এটি টেস্টোস্টেরোনের কার্যকারিতাকে বাধাগ্রস্ত করে। ছোট থেকে মাঝারি আকারে পুরুষদের টাকের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এটি দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যেহ খেতে হয়। এটির মোট চিকিৎসা ব্যয় মিনোক্সিডিলের চেয়ে বেশি পড়লেও এটি বেশ সহনীয়। এই ওষুধটি মিনক্সিডিল অপেক্ষা ভালো এবং চুলপড়া কমানোর পাশাপাশি চুল গজাতেও কার্যকর। তবে সন্তান ধারণক্ষম মহিলাদের এটি ব্যবহার না করাই ভালো। এই ঔষধ সমূহ সাফল্য ও জনপ্রিয়তা ‘হেয়ার-ট্রান্স প্লানটেশন’ এর চাহিদা অনেক কমিয়ে দিয়েছে। তবে যাই করেন বিশেষজ্ঞের পরামর্শক্রমে চিকিৎসা নিতে হবে। অন্যথায় ক্ষতি হতে পারে।

অকালে চুল পড়া রোধ করতে আপনাকে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন বি, ই, ও অন্যান্য মিনারেল জাতীয় খাবার অবশ্যই খেতে হবে।

আমাদের সমাজে একটা ভুল ধারনা আছে যে; প্রতিদিন শ্যাম্পু করলে চুল পড়ে যায়। আসলে শ্যাম্পু করলে মাথার চামড়া পরিষ্কার থাকে। তবে সব শ্যাম্পু প্রতিদিন ব্যবহার করা যায় না। প্রতিদিন ব্যবহারের কিছু শ্যাম্পু আছে, যা ব্যবহার করলে কখনোই চুল পড়ে না। চুল বেশি বেশি আঁচড়ালে নাকি চুলের স্বাস্থ্য ভালো থাকে বলে অনেকেই বলেন; ইহাও ভুল ধারনা। চুল বেশি আঁচড়ালে টান লেগে বরং চুল পড়ার হার বেড়ে যায়। দিনে পাঁচ-ছয়বার আঁচড়ানোই যথেষ্ট। চুল বারবার কামালে ঘন চুল ওঠে বলে ছোটবেলায় আমরা অনেকেই মাথা ন্যাড়া করেছি। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বেশি বার কামালে হেয়ার ফলিকল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এতে বরং চুল কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

তেল দিলে চুল ঘন হয় বলে মনে করেন বেশির ভাগ মানুষ। বাস্তবে চুল ঘন হওয়ার সঙ্গে তেলের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে চুল তেল দিয়ে মসৃণ রাখলে জট লেগে চুল ছেঁড়ার আশঙ্কা কম থাকে। গরম তেল মালিশ করলে চুল স্বাস্থ্যোজ্জ্বল থাকে বলেও কারো কারো ধারণা। কিন্তু গরম তেল হেয়ার ফলিকলে ক্ষতি করতে পারে। অবশ্য সাধারণ তাপমাত্রার তেল দিয়ে মাসাজ করলে চুলের গোড়ার রক্তসঞ্চালন খানিকটা বাড়ে।

চুল টাইট করে বেণী করে ঘুমালে চুলের বৃদ্ধি বেশি হয় বলে মেয়েরা মনে করে। কিন্তু বেশি টাইট করে না বাঁধাই ভালো। এতে চুল উঠে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

courtesy~ charpoka.org

Comments

comments




error: Content is protected !!