১৬ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং, ২রা পৌষ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২৮শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯ হিজরী

দীর্ঘমেয়াদে রোহিঙ্গারা থাকলে যেসব সংকটের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ, সবারি জানা উচিত।

অক্টোবর ৬, ২০১৭, সময় ১০:০৭ পূর্বাহ্ণ

কক্সবাজারের সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা (ফাইল ছবি)আগস্টের শেষ দিক থেকে মিয়ানমারের রাখাইনে নতুন করে শুরু হওয়া সহিংসতায় রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার পাশাপাশি বসতভিটায় আগুন দেওয়া হয়েছে। এতে করে লাখ লাখ রোহিঙ্গা এখন উদ্বাস্তু হয়ে পড়েছে। প্রাণ বাঁচাতে তারা সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে আসছে বাংলাদেশে। তাদের আশ্রয় দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যতদিন শঙ্কিত এসব মানুষ আসবে, বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দেবে।

তবে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় তাদের অবস্থানের কারণে মানবিক, নিরাপত্তাজনিত, রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংকটের আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে কী প্রভাব পড়তে পারে, সেই বিষয়ে না ভেবে বরং যত দ্রুত সম্ভব আন্তর্জাতিক সহায়তা নিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা জরুরি। তারা দীর্ঘমেয়াদে থাকবে, বা আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে, এধরনের পরিকল্পনা করা বিপজ্জনক।

জরুরি পরিস্থিতি, কৌশল হিসেবে ভুল

বাংলাদেশে এখন সব মিলিয়ে প্রায় ৯ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে৷ এরমধ্যে পাঁচ লাখ এসেছে গত ২৫ আগস্টের পর থেকে৷ এখনও প্রতিদিন শত শত রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসছে বাংলাদেশে। ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের এক জায়গায় রাখতে কুতুপালং-এর বালুখালীতে অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র করা হয়েছে৷ সেখানে এ পর্যন্ত দুই লাখ রোহিঙ্গাকে নেওয়া গেছে৷ বাকিরা কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অবস্থান করছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

উখিয়ার বালুখালী এলাকায় রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী বসতি। ছবি: বাংলা ট্রিবিউনজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ২৪টি স্পট থেকে খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। এই শরণার্থীদের বড় অংশই নারী ও শিশু। রোহিঙ্গারা এখনও আসছে। তবে প্রবেশ পথ পরিবর্তন করেছে। এখন তারা নৌকায় নাফ নদী পেরিয়ে টেকনাফের শাহপরী দ্বীপ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে৷

বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকটের প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী হলেও মানবিক সহায়তায় কখনও পিছপা হয়নি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই সংকটের একটি স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখনই সময় এই ইস্যুটিকে আন্তর্জাতিকভাবে চিহ্নিত করা এবং সামনে আনা। এখনকার যে জরুরি পরিস্থিতি, এটি কৌশল হিসেবে ভুল। কেননা, এরপর বাংলদেশকে স্থানীয়ভাবে যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হতে হবে, সেটা ভয়াবহ।’

নো-ম্যানস ল্যান্ডে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ

স্থানীয়দের সঙ্গে সংকট বাড়বে

নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য সরকার যে দুই হাজার একর জমি নির্ধারণ করে দিয়েছে, এরমধ্যে মধুরছড়ার পাহাড়ও রয়েছে। অনেক আগে থেকেই স্থানীয় বাংলাদেশিরা সরকারি বনভূমি দখল করে বসতি গড়ে তুলেছিল। কিন্তু রোহিঙ্গাদের বসতির জন্য এখন স্থানীয়রা জায়গা করে দিলেও পরবর্তীতে তারা প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। সেরকম পরিস্থিতি হলে সরকার কিভাবে সামাল দেবে, সেই দূরদৃষ্টি থাকা জরুরি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ লাখো মানুষের বসতি গড়ে উঠেছে যেখানে-সেখানে। স্বার্থের সংঘাত শুরু হলে বিপদ বাড়বে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সি আর আবরার বাংলা ট্রিবেউনকে বলেন, ‘আমরা এখনকার মানবেতর পরিস্থিতি সামলতে গিয়ে পরের বিষয়টা মাথায় নিচ্ছি না। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়েছে। এই সময়টাকে কাজে লাগাতে শক্তিশালী কূটনীতি দরকার।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয়দের বসতভিটার চারপাশে ছাপড়া তৈরি করে থাকতে দিয়েছেন যারা, তারাই কিন্তু দীর্ঘসময় এই বিষয়টি চালিয়ে যেতে পারবেন না।’

মানবিক সংকটের মুখোমুখি

সারাবিশ্বে বর্তমানে মোট উদ্বাস্তুর সংখ্যা ছয় কোটি ৫৬ হাজার। এরমধ্যে এখন সবচেয়ে বেশি সংকটের মধ্যে আছে রোহিঙ্গারা। তাদের সংখ্যা এখন ২২ লাখেরও বেশি। এরমধ্যে ছয় লাখ রোহিঙ্গা পাড়ি জমিয়েছে সৌদি আরবে। অন্যান্য দেশে আরও কিছু রোহিঙ্গা আছে। সবচেয়ে বেশি আছে বাংলাদেশে। ব্র্যাকের অভিবাসন প্রকল্পের প্রধান শরীফুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মিয়ানমারে থাকলে মৃত্যু নিশ্চিত জেনে রোহিঙ্গারা দেশান্তরী হওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছে। তাদের ওপর সহিংসতা ও তাদের সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে আসার ফলে তৈরি হওয়া মানবিক সংকটই এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকট। এটা বাংলাদেশের জন্যও বিশাল একটি সংকট।’
উল্লেখ্য, গত ৮ সেপ্টেম্বর যখন তিন লাখ রোহিঙ্গা এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল, তখনই জাতিসংঘ জানিয়েছিল, এটি মানবিক বিপর্যয়ের রূপ নিতে পারে। অন্যদিকে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির কর্মকর্তারা বলছেন, ‘যেভাবে শরণার্থী বাড়ছে, তাতে শিগগিরই আশ্রয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।’

রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন চলছে

অর্থনৈতিক সংকট

এই ব্যয় ভার বাংলাদেশকেই আপাতত বহন করতে হবে। ফলে এর চাপ পড়বে জাতীয় বাজেটের ওপর। এই চাপ কমাতে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর ছাড়াও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দাতা সংস্থাকে রোহিঙ্গাদের থাকা-খাওয়ার ব্যয় নির্বাহের জন্য সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। ৯ লাখ রোহিঙ্গার জীবন-যাপনে বছরে কী পরিমাণ অর্থ লাগতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ জন্য বছরে চার হাজার ৮০০ থেকে ছয় হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। এটা খুব বেশি না হলেও জাতীয় বাজেটে কিছু চাপ পড়বে।’

আইন-শৃঙ্খলার অবনতির শঙ্কা

এখনও সব রোহিঙ্গাকে এক জায়গায় নেওয়া সম্ভব হয়নি উল্লেখ করে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মাহিদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রোজ শত শত রোহিঙ্গা ঢুকছে এখনও। সবাইকে একত্র করা যায়নি। বালুখালী ক্যাম্পে রাখার যাবতীয় প্রস্তুতি কবে নাগাদ সম্পন্ন হবে, সেটিও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ফলে পরিস্থিতি এখনও কিছুটা অনিয়ন্ত্রিত আছে। তবে শুরুর চেয়ে অনেকটা গুছিয়ে আনা গেছে।’

জীবন বাঁচাতে মংডুর জঙ্গলে রোহিঙ্গা নারী ও শিশু (ছবি: আমানুর রহমান রনি)ছড়ানো ছিটানো থাকার কারণে যদি রোহিঙ্গাদের দ্রুত একজায়গায় আনা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে কিনা, প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি। তেমন কিছু হবে না বলেই আশা রাখি। তবে ক্যাম্পের বাইরের এলাকায় কেউ ‍বসবাস শুরু করেছে কিনা, সেটা নজরদারিতে রাখা দরকার।’

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান মনে করেন, এখন থেকে সঠিক পরিকল্পনা না করলে এই বিশাল জনগোষ্ঠী নিয়ে ঝামেলায় পড়তে হবে। আমরা আন্দাজ করতে পারছি না, ওইটুকু জায়গায় ১০ লাখ মানুষকে কী করে রাখা যাবে? দুস্থ, ভীত, মার খাওয়া মানুষ পালিয়ে আশ্রয় নিতে এসেছে যখন, তখন শুরুতে আমরা তাদের আপ্যায়ন ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছি। কিন্তু যখন মৌলিক ইস্যুগুলোতে সংঘাত হবে, তখন বিষয়টি মানবিক থাকবে কিনা- তা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে।’

রোহিঙ্গাদের নিয়ে অবৈধ ব্যবসা করলে ছাড় নেই: র‌্যাবের ডিজি

রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে র‌্যাবের ডিজি র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ বলেছেন, ‘রোহিঙ্গারা নির্যাতিত। তাদের নিয়ে যদি কেউ অবৈধ ব্যবসা ও অপরাধ করে তাদের আমরা ছাড় দেব না। তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে।’ বৃহস্পতিবার (৫ অক্টোবর) বিকালে টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণকালে এসব কথা বলেন তিনি।

র‌্যাবের ডিজি আরও বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে আসা রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের সহায়তায় কাজ করবে র‌্যাব। এজন্য র‌্যাবের জনবল বাড়ানোসহ টেকনাফে একটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। যাতে করে সবার নিরাপত্তা বিধানে র‌্যাব আইনি ভূমিকা রাখতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘সরকারের উদ্দেশ্য নির্যাতিত এসব রোহিঙ্গাদের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা। এজন্য কোনও রোহিঙ্গা যাতে এই নির্দিষ্ট জায়গার বাইরে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেজন্য সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।’ এজন্য স্থানীয় জনগণ ও সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষের সহায়তা কামনা করেন তিনি।

এরপর ক্যাম্পের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেন র‌্যাবের মহাপরিচালক।

উদিসা ইসলাম, বাংলা ট্রিবিউন

Comments

comments