২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৮ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা জমাদিউস-সানি, ১৪৩৯ হিজরী

এক কোটি টাকায় ১৪ শ্রমিকের মুক্তি, এখনও জিম্মি ৮ জন বাংলাদেশি…।

অক্টোবর ৯, ২০১৭, সময় ৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ

ভালো বেতন ও উন্নত পরিবেশে চাকরি দেয়ার কথা বলে কয়েক দফায় টাকা নিয়ে বিদেশে পাঠানোর পর শ্রমিকদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করছে একটি চক্র। সম্প্রতি চক্রটির হাতে ২২ বাংলাদেশি শ্রমিক জিম্মি হন। এর মধ্যে কোটি টাকার বিনিময়ে মুক্তি পেয়েছেন ১৪ জন। কিন্তু টাকা দিতে না পারায় এখনও জিম্মি আটজন।

প্রতারকচক্রের হাত থেকে মুক্তিপণের বিনিময়ে ছাড়া পেয়ে দেশে আসার পর ভুক্তভোগী সাদ্দাম হোসেনের বক্তব্যে উঠে এসেছে রোমহর্ষক নানা তথ্য। ওই ভুক্তভোগীর মুক্তিতে সহযোগিতা করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

লিবিয়ার জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পাওয়া সাদ্দাম ইতোমধ্যে দেশে ফিরেছেন। এর আগে আউটপাস ভিসার মাধ্যমে দেশে ফিরেছেন আরও দুই বাংলাদেশি শ্রমিক। তবে তদন্তের স্বার্থে পিবিআই তাদের নাম-ঠিকানা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করে।

জিম্মি থাকা বাকি আটজনের ব্যাপারেও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছে পিবিআই। তাদের উদ্ধার এবং জিম্মি করেছে যারা; তাদের আইনের আওতায় আনতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে দূতাবাসের মাধ্যমে যোগাযোগ শুরু করেছে পুলিশ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

ভুক্তভোগী সাদ্দামের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রতারকচক্রের দেশীয় চার সদস্যকে গত শুক্রবার রাতে ঢাকা ও কিশোরগঞ্জ থেকে আটক করেছে পিবিআই। চক্রের সদস্যদের আটকের খবরে গ্রাম থেকে ধানমন্ডির পিবিআই সদর দফতর কার্যালয়ে ছুটে আসেন বিদেশে জিম্মি থাকা বাংলাদেশি ক’জন নাগরিকের স্বজন।

পিবিআই সদর দফতরের স্পেশালাইজড ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশন বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার আহসান হাবীব পলাশ জাগো নিউজকে বলেন, ভালো বেতন এবং উন্নত পরিবেশে চাকরির কথা বলে নেত্রকোনার বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেনকে (২৩) লিবিয়ায় নিয়ে যায় একটি চক্র। তারপর পাসপোর্টসহ সব বৈধ কাগজপত্র হাতিয়ে নিয়ে একটি ক্যাম্পে সাদ্দামকে আটকে রাখে সে দেশে অবস্থানরত চক্রের সদস্যরা।

আশ্বাস অনুযায়ী কাজ না দিয়ে বরং তাদের ওপর চলতে থাকে অমানুষিক নির্যাতন। আর সেই নির্যাতনের ছবি, ভিডিও দেশে অবস্থানরত স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে অর্থ আদায় করে চক্রটি। এভাবে কয়েক দফায় সাড়ে ৯ লাখ টাকার বিনিময়ে সেই চক্রের হাত থেকে ছাড়া পান সাদ্দাম।

লিবিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসের মাধ্যমে গত ২৭ সেপ্টেম্বর সাদ্দামকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ওই ঘটনার তদন্ত শুরু করে পিবিআই। তদন্তের ধারাবাহিকতায় প্রতারক চক্রের চার সদস্যকে আটক করা হয়। তারা হলেন— তাসলিম উদ্দিন (৫০), মোফাজ্জল হোসেন (৪৮), আইয়ূব আলী (৫২) ও আরমান সরকার (৪২)।

পিবিআই কার্যালয়ে গতকাল শনিবার দুপুরে কথা হয় জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পাওয়া সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, প্রায় ১১ মাস আগে ভাগ্য বদলের আশায় শ্রমিক ভিসায় লিবিয়া যাই। যারা পাঠায় তারা লিবিয়ার একটি চক্রের সঙ্গে যোগসাজশে আমাদের জিম্মি করে।

সাদ্দাম বলেন, গত বছরের ডিসেম্বরে লিবিয়ায় যাওয়ার পর সেখানকার বিমানবন্দর থেকে কয়েকজন আমাকে রিসিভ করে। এরপর একটি ক্যাম্পে নিয়ে যায়। এরপরই টানা তিন মাস একই স্থানে রেখে মারধর করে এবং দেশে থাকা স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে। পরে তারা আমাকে এক পাকিস্তানির কাছে বিক্রি করে দেয়। তারা সেখানেও নির্যাতন করে আমার কাছে মুক্তিপণ দাবি করে।

তিনি বলেন, আমাকে তিন-চারবার বিক্রি করা হয়। ৫০০ দিনারে একজন আরেকজনের কাছে আমাকে বিক্রি করে। পরে সেই লোক আবার আমার কাছে ১০ হাজার দিনার দাবি করে। সেখানে বাঙালি-পাকিস্তানি-লিবিয়ানরা মিলে এ কার্যক্রম চালায়। আমার মতো আরও ১৩-১৪ জন বাঙালিকে জিম্মি অবস্থায় সেখানে দেখেছি।

পিবিআই কার্যালয়ে কথা হয় গাজীপুরের ভালুকা এলাকার শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, জমি-জমা বিক্রি করে ছোট ভাই মফিজুল ইসলামকে ইরাকে পাঠাই। সেখানে পাঠানোর পর জিম্মি করা হয় তাকে। এরপর খবর আসে টাকা না দিলে মেরে ফেলবে। ভাইকে বাঁচাতে গিয়ে ৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা দেই। দেশ থেকে সে টাকা তুলে নেন আটক তসলিম। তসলিমের বাড়ি গাজীপুরে। এ চক্রের মূলহোতা বগুড়া জেলার মোতাহার।

‘তসলিম, মোতাহার ও সালমাসহ ছয়-সাতজন মিলে আমার ভাইকে ইরাকে জিম্মি করা হয়। টাকা নেয়ার পর ছেড়ে দেয়। মফিজুল এখন ইরাকে একটি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাপ্রহরীর চাকরি করছেন’ বলেন শফিকুল ইসলাম।

শফিকুলের স্ত্রী জেসমিন বেগম বলেন, আমার সাজানো সংসার তছনছ করে দিয়েছে প্রতারকরা। ওদের যেন এমন শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে কারও সঙ্গে প্রতারণা করতে না পারে।

জনি নামে ঝিনাইদহের কালিগঞ্জ উপজেলার এক যুবক এখনও ইরাকের বাগদাদ শহরে জিম্মি রয়েছেন। তার ভাই (নাম বলেননি) পিবিআই কার্যালয়ে জাগো নিউজকে বলেন, আমার ভাইকে বাঁচানোর জন্য পিবিআইয়ের সহযোগিতা চেয়েছি। তারা আন্তরিক। দেশে চার প্রতারক আটকের পর ওই চক্রের হোতা মোতাহার ফোন করে হুমকি-ধামকি দিচ্ছে। ভাইকে মেরে ফেলবে। মোতাহার এর আগে কয়েকবার মানবপাচার ও জিম্মি করার অপরাধে জেল খেটেছে। তবে জামিনে বেরিয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়েছে। তসলিমের ভাগ্নে ইরাকে থাকে। সেই জিম্মি করেছে জনিকে।

এ ব্যাপারে পিবিআই’র বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) আহসান হাবীব পলাশ বলেন, লিবিয়া ও ইরাকে মানবপাচারকারী চক্রটি সক্রিয় বলে আমরা জানতে পেরেছি। লিবিয়ায় এ চক্রের সঙ্গে সে দেশের বাঙালি ও লিবিয়ানরাও জড়িত। চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দেশের যুবকদের জিম্মি করে সেখানে নির্যাতন চালানো হচ্ছে।

তিনি ভুক্তভোগী স্বজনদের বরাত দিয়ে বলেন, এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে নয়জনকে জিম্মি করে রাখার অভিযোগ এসেছে। তাদের মধ্যে সাদ্দামকে আমরা উদ্ধার করতে সক্ষম হযেছি। যদিও তাকে উদ্ধার করতে টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে।

‘৪-৫ লাখ টাকা খরচ করে লিবিয়ায় যাওয়ার পর ভুক্তভোগীদের পরিবারের কাছ থেকে আরও তিন থেকে ৯ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে’ বলেও জানান পিবিআই এই কর্মকর্তা।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ঠিক কতটি চক্র সক্রিয় রয়েছে তা আমাদের জানা নেই। আমরা এখনও ওই চক্রের সে দেশের (লিবিয়া) কোনো সদস্যকে গ্রেফতার করতে পারিনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসের সহযোগিতায় বিভিন্ন দেশে জিম্মি বাংলাদেশিদের জীবিত উদ্ধার এবং প্রতারকচক্রের সদস্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে- বলেন বিশেষ পুলিশ সুপার আহসান হাবীব পলাশ।

Comments

comments




error: Content is protected !!