Thursday , April 19 2018
সর্বশেষ খবর
Home / ভাইরাল / সাপে কামড়ালে কী করবেন

সাপে কামড়ালে কী করবেন

সাপ ও মানুষের সম্পর্ক কেমন? নিশ্চয় বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। সাপের কামড়ের হুমকির মুখে রয়েছে আফ্রিকা, এশিয়া ও আমেরিকার অনেক মানুষের জীবন। আমাদের দেশেও বিশেষত গ্রামাঞ্চলের মানুষ সাপের কামড়ের হুমকির মুখে থাকে। এ কথা সবাই মানবেন যে, পৃথিবীতে সাপের কামড় হচ্ছে সবচেয়ে অবহেলিত জনস্বাস্থ্য সমস্যা।

যে সব পল্লী এলাকায় খুব বেশি সাপের কামড়ের ঘটনা ঘটে, সে সব এলাকায় কতজন সাপেড় কামড়ে মারা গেল তার সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। উন্নত দেশে সামান্য কিছু তথ্য পাওয়া যায়। বাংলাদেশে পরিচালিত স্বরুপ বি ও গ্রাব বি’র গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি বছর প্রায় ৫ লাখ লোক সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়। যার মধ্যে প্রায় ৩০-৪০ হাজার লোক মারা যায়। চিপাইউক্স’র সমীক্ষায় দেখা যায়, প্রতি বছর সারা বিশ্বে বিষাক্ত সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয় ৫৪ লাখ মানুষ, প্রায় ২৫ লাখ মানুষের মাঝে বিষ প্রয়োগ হয় এবং ১ লাখ ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।

সকল সমীক্ষা-পরীক্ষায় দেখা যায়, বিষাক্ত সাপের বিষে আক্রান্ত হয় দক্ষিণ এশিয়ায় ১ লাখ ২১ হাজার, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ১ লাখ ১১ হাজার এবং পূর্ব আফ্রিকায় প্রায় ৪৩ হাজার। সাপের কামড়ে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় পল্লী এলাকার মানুষ।

বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মেডিসিন অনুষদের প্রফেসর মো. রিদওয়ানুর রহমানের গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে বছরে সাপের কামড়ের হার ৬২৩.৪। এই গবেষণায় আরও দেখা যায়, প্রতি বছর পল্লী এলাকায় ৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৯ বার সাপে কামড়ের ঘটনা ঘটে। যার মধ্যে ৫ লাখ ৮৯ হাজার ৯১৯ জন সাপে কামড়ে আক্রান্ত হয় এবং ৬ হাজার ৪১ জনের মৃত্যু হয়।

দেশে সবচেয়ে বেশি সাপের কামড়ের ঘটনা ঘটে বরিশালের দক্ষিণ-পশ্চিম তীরবর্তী এলাকায়। এরপর খুলনা এলাকায়।

সাপের কামড়ের লক্ষণসমূহ : এক এক ধরনের সাপের কামড়ে এক এক ধরনের লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়। ‘থ্রম্বোলাইটিক’ বিষধর সাপ কামড়ালে আক্রান্ত স্থানে মারাত্মক পচন ধরে। সাপের কামড়ে আক্রান্ত ব্যক্তি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যায় এবং মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়ে। বমি, পাতলা পায়খানা, মাথা ঘোরানো, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া অথবা শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যেতে পারে।

বিষবিহীন সাপও মানুষের ক্ষতি সাধন করে। বিষবিহীন অথবা বিষধর সকল সাপ আক্রান্ত স্থানে ক্ষতের সৃষ্টি করে। সেখানে সামান্য ব্যথা থাকে এবং লাল হয়ে যায়। ভাইপার এবং কোবরা সাপ কামড়ালে প্রচণ্ড ব্যথা হয় এবং আক্রান্ত স্থান ফুলে লাল হয়ে যায়, সেখান থেকে রক্তপাত হয় ও ফোসকা উঠে এবং পরবর্তী সময়ে পচন শুরু হয়।

পিট ভাইপার ও ভাইপার সাপের অন্যান্য লক্ষণসমূহ হল— অবসাদ, দুর্বলতা, রক্তপাত ও বমি হওয়া। সময়ের সাথে সাথে জটিলতা বাড়তে থাকে। যেমন— রক্তচাপ কমে যাওয়া, শ্বাসপ্রশ্বাস বেড়ে যাওয়া, পালস বেড়ে যাওয়া এবং ধীরে ধীরে কিডনী ও ফুসফুস অকার্যকর হয়ে পড়ে। মজার ব্যাপার হল র‌্যাটল, ক্রেইট, কোরাল সাপের কামড় মারাত্মক জখম করলেও আক্রান্ত ব্যক্তি তেমন ব্যথা পায় না।

কিছু কিছু কোবরা আছে যারা আক্রান্ত ব্যক্তির চোখে থুথু ছিটায় যার ফলে চোখে ব্যথা হয়, চোখ অবশ হয়ে যায় এবং অন্ধ হয়ে যায়। কিছু সামুদ্রিক সাপ আছে যাদের কামড়ের ফলে মাংসে পচন ধরে। শরীরের সমস্ত মাংসে পচন ধরে। এটাকে বলে ‘রেবডোমায়োলাইসিস’ যার ফলে ধীরে ধীরে কিডনী অকার্যকর হয়। চিকিৎসা ব্যতীত আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু হয়।

সাপের বিষ সাধারণত শরীরের সমস্ত অঙ্গকে আক্রান্ত করে। নানা রকম টক্সিন যেমন— সাইটোটক্সিন, হিমোটক্সিন, নিউরোটক্সিন অথবা মায়োটক্সিন বিভিন্ন ধরনের লক্ষণ প্রকাশ করে।

প্রতিরোধ : আক্রান্ত না হলে সাপ সাধারণত কামড়ায় না। তাদের শিকার— যেমন ইঁদুরের আকর্ষণে সাপ মানুষের আবাসস্থলে আসে। তাই দেখা গেছে, ইঁদুরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সাপের উপদ্রবও কমে যায়।

চিকিৎসা : চিকিৎসার প্রথমেই ঠিক করতে হবে সাপটি বিষধর কিনা। সাপে কামড়ালে তা আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের ওপর কতটুকু ক্ষতিকর হবে সেটি নির্ভর করে কতগুলো বিষয়ের ওপর যেমন— আক্রান্ত ব্যক্তির বয়স, উচ্চতা, শারীরিক অবস্থা, আক্রান্ত স্থান, বিষের পরিমাণ, চিকিৎসা শুরুর দ্রুততা ইত্যাদি।

সাপের প্রকার নির্ধারণ : সাপের চিকিৎসার শুরুতে সাপের প্রকার জানাটা জরুরি। যদিও সবসময় তা সম্ভব হয় না। অনেক সময় সাপে আক্রান্ত ব্যক্তির লোকজন সাথে করে মরা সাপ নিয়ে আসে। তা ছাড়া কোন এলাকায় কোন ধরনের সাপের প্রার্দুভাব বেশি তা সাপ চিনতে সহায়ক হতে পারে। আমাদের দেশে সাধারণত তিন ধরনের বিষাক্ত সাপ দেখতে পাওয়া যায়। এগুলো হল— ভাইপার, ক্রেইট এবং কোবরা।

প্রাথমিক চিকিৎসা : যেহেতু এক এক সাপের বিষ একেক রকম। তাই বিষভেদে প্রাথমিক পরিচর্যা বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। সাধারণত প্রাথমিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখতে হয়—

* আক্রান্ত ব্যক্তি অথবা অন্যান্য ব্যক্তিরা যাতে পুনরায় সাপের কামড়ে আক্রান্ত না না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। যদিও চিকিৎসার জন্য অনেক সময় সাপটি দরকার তার প্রকার জানার জন্য, কিন্তু তা করতে গিয়ে যেন কেউ সাপের কামড়ে আক্রান্ত না হয় অথবা চিকিৎসার দেরি না হয় তা লক্ষ্য রাখতে হবে।

* রোগীকে শান্ত রাখতে হবে।

* রোগীকে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যেতে হবে।

* রোগীর আক্রান্ত স্থান হার্ট লেভেলের নিচে রাখতে হবে।

* রোগীকে কিছু খেতে বা পান করতে দেওয়া যাবে না। বিশেষ করে এ্যালকোহল জাতীয় পদার্থ।

* কাপড় অথবা এমন কোনো জিনিস, যেমন— ঘড়ি, আংটি, ব্রেসলেট, যা আক্রান্ত অঙ্গকে চেপে ধরে তা খুলে ফেলতে হবে।

* সাপের কামড়ের স্থানে কোনো কাটাছেঁড়া করা যাবে না।

এ্যান্টিভেনম : এ্যান্টিভেনম আবিষ্কারের পূর্বে বিষাক্ত সাপের কামড় মানে ছিল নিশ্চিত মৃত্যু। অনেক চিকিৎসা থাকলেও এ্যান্টিভেনম সাপের বিষের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি কার্যকর। ফরাসী চিকিৎসক আলবার্ট কেলমেট ১৮৯৫ সালে এ্যান্টিভেনম আবিষ্কার করেন। এটি শিরার মধ্যে দিতে হয়। আধুনিক এ্যান্টিভেনম পলিভেলেন্ট, যা বিভিন্ন জাতের সাপের বিষের বিরুদ্ধে কাজ করে। ওষুধ কোম্পানিগুলো যে এলাকায় যে ধরনের সাপের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যায় সেই সাপের বিরুদ্ধে এ্যান্টিভেনম তৈরি করে। দুর্ভাগ্যজনক যে, বাংলাদেশের সব জায়গায় সব হাসপাতালে এ্যান্টিভেনম পাওয়া যায় না। যার ফলে সাপের কামড়ে মৃত্যুর হার বেড়েই যাচ্ছে।

সময় এসেছে এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার। যার ফলে বেঁচে যেতে পারে অসংখ্য মানুষের প্রাণ।

বাংলাদেশের উত্তর ও মধ্য অঞ্চল বেশ কিছু এলাকা সম্প্রতি বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে। বন্যা দুর্গত মানুষের অনেকগুলো স্বাস্থ্য বিষয়ক সমস্যার মুখোমুখি হবেন। একই সাথে এ সময়টাতে সাপে কামড়ের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই সাপের কামড় প্রতিরোধ ও আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা পূর্ব প্রস্তুতি থাকা জরুরি।

লেখক
ডা. শাহজাদা সেলিম
সহকারী অধ্যাপক
এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

Check Also

এক দর্শকের সামনে আমি একবার ফোন চেক্স ও করি, ফাঁস করলেন রাধিকা আপ্তে!

রাধিকা আপ্তে, মানেই সোজাসাপটা, সাহসী, ঠোঁটকাটা অভিনেত্রী। যাঁর অভিনয়ের তীক্ষ্ণতা দিয়েই তিনি দর্শকের নজরে আসেন। …