১৬ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং, ২রা পৌষ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২৮শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯ হিজরী

নতুন বাংলাদেশ! হয়ে যাচ্ছে দখল।

নভেম্বর ২৮, ২০১৭, সময় ৬:২৯ অপরাহ্ণ

চরলক্ষ্মী, চরনোমান, চরবায়েজিদের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে লক্ষ্মী অ্যাগ্রো ফিশারিজ। স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপে জানা গেল, ওখানে জমির পরিমাণ ৪৬২ একর। নামে ফিশারিজ হলেও চারদিক ঘেরাও করে রাখা জায়গাটিতে মাছ চাষের কোনো আলামত দেখা গেল না।

স্থানীয় লোকজন জানালেন, এই জমির মালিক বন্ধ হয়ে যাওয়া ডেসটিনি গ্রুপের পরিচালক আল ফরিদ। নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার মেঘনা অববাহিকার এই চরগুলোর বিশাল এলাকায় কয়েক বছর আগেও ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়াতেন তিনি। ২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সেখানে ছিল তার একাধিপত্য। প্রায়ই তিনি ঢাকা থেকে সদলবলে চলে আসতেন। রাতে জমানো হতো আসর। সাধারণ মানুষ দূর থেকে মাছ-মাংস ঝলসানোর (বারবিকিউ) আগুন দেখতে পেলেও আল ফরিদের ওই রাজ্যে তাদের প্রবেশাধিকার ছিল না।

স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছ থেকে আল ফরিদ নামে ওই ব্যক্তির একটি মোবাইল ফোন নাম্বার পাওয়া গেল, কিন্তু ওই নাম্বারটি এখন আর সচল নেই। পরে তার গ্রামের বাড়ি সুবর্ণচরেরই চরক্লার্কে গিয়ে জমি দখল করে কোটিপতি বনে যাওয়া ফরিদের আরও অনেক দখলের গল্প জানা যায়। ডেসটিনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রফিকুল আমীনের বাড়ি সুবর্ণচরের পাশের উপজেলা হাতিয়ায় এবং তারা পরস্পরের ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে আল ফরিদ ডেসটিনির পরিচালক হওয়ার সুযোগ পান।

পরে ২০১২ সালের ৩১ জুলাই ডেসটিনির বিরুদ্ধে গ্রাহকদের টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের দুই মামলায় ফরিদকেও আসামি করা হয়। চরক্লার্কে গিয়ে তার পরিবারের কাউকে পাওয়া গেল না। তবে ফরিদের ভাগ্নি জামাতা বাংলাবাজার লর্ড লিওনার্ড চেশায়ার উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক নুরুল্লাহ বলেন, ‘মামা (আল ফরিদ) অনেক দিন হলো গ্রামে আসেন না। শুনেছি তিনি সৌদি আরবে আছেন। তবে তার পরিবার ঢাকায় আছে।’

আল ফরিদের দখল করা জায়গার বিষয়ে নুরুল্লাহ বলেন, ‘শুনেছি মামা ওই জায়গার কিছু অংশ শাহজাহান নামে এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। তবে এই বেচাকেনা নিয়ে আমি নিশ্চিত নই। ইদানীং আবার শুনছি তার বিশাল জায়গার কিছু অংশ অন্য প্রভাবশালীরাও দখল করে নিয়ে গেছে।’

তালিকার চেয়ে দখলদার বেশি : তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এভাবেই দখল হয়ে যাচ্ছে নোয়াখালীর উপকূল এলাকায় জেগে ওঠা ‘নতুন বাংলাদেশ’। তবে ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন দখলদাররা। পরে এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ৫৮টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করে ক্ষতিপূরণ আদায় করে।

২০০৯ সালেও নোয়াখালীর জেলা প্রশাসন অবৈধ দখলদার হিসেবে ৪৩টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেছিল। অবশ্য এতে থামেনি দখলদারদের দৌরাত্ম্য। মেঘনা অববাহিকার যেখানেই নতুন চর জাগে, সেখানেই শুরু হয় প্রভাবশালীদের দখল। দখলদারদের মধ্যে আওয়ামী লীগ-বিএনপি নেতারা যেমন আছেন; তেমনি আছেন প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠী। কাজটি হয়েছে প্রশাসনের নাকের ডগায়, তাদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি হিসাবে মৎস্য খামারের নামে শুধু সুবর্ণচরে দখল হয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ ১১ হাজার ৫৪ দশমিক ৬৭ একর। তবে অন্যান্য সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দখল হয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার একর।

জেগে ওঠা ‘নতুন বাংলাদেশ’ : বাংলাদেশ সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) হিসাব অনুযায়ী, নোয়াখালীতে ৭০ বছরে প্রায় ২০০ বর্গকিলোমিটার ভূমি ক্ষয় হলেও একই সময়ে নতুন করে এক হাজার বর্গকিলোমিটার যুক্ত হয়েছে।

নেদারল্যান্ডস সরকারের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত অ্যাকচুয়ারি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (ইডিপি) গবেষণা ও জরিপ কার্যক্রমে দেখা গেছে, ১৯৭৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত নোয়াখালী উপকূলে ৫৭৩ বর্গকিলোমিটার ভূমি নদী থেকে জেগে ওঠে। আবার একই সময়ে জেগে ওঠা ভূমির ১৬২ বর্গকিলোমিটার নদীতে বিলীন হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এই সময়ের মধ্যে টিকেছে ৪১১ বর্গকিলোমিটার।

এই হিসাবে বছরে গড় বৃদ্ধি দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৭৫ বর্গকিলোমিটার। জেগে ওঠা ‘নতুন বাংলাদেশে’র চিত্রটি বোঝার জন্য সরেজমিন জানা গেল, নোয়াখালীর মূল ভূখণ্ডের বিভিন্ন নৌঘাট কয়েক বছর পর পর কয়েক কিলোমিটার করে এগিয়ে নিতে হচ্ছে। মাত্র কয়েক বছর আগেও সুবর্ণচর উপজেলার চরবাটা স্টিমার ঘাট (চার নম্বর ঘাট) থেকে সি-ট্রাক ছেড়ে যেত হাতিয়ার দিকে।

এখন এই ঘাট টেনে নিয়ে যেতে হয়েছে আরও অন্তত ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে। পুরনো এ লঞ্চঘাট এলাকার আশপাশসহ চরআলাউদ্দিন, চরনোমান, চরবায়েজিদ, চরআক্রাম উদ্দিন, চরমকসেমুল পর্যন্ত নতুন জেগে ওঠা বহু চর এখন চিংড়ি ঘেরসহ নানা প্রকল্পের নামে প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছেন।

আলোচনার শীর্ষে দুই নেতা : চর দখল নিয়ে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন দুই রাজনৈতিক নেতা। তারা হলেন নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ) আসনের বিএনপিদলীয় সাবেক সাংসদ বরকত উল্লাহ বুলু ও সরকারদলীয় বর্তমান সাংসদ মামুনুর রশিদ কিরণ। ব

র্তমানে বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলুর দাবি, সুবর্ণচরের যে ১০০ একর জমিতে তার মালিকানাধীন সলজিত ডেইরি অ্যান্ড মৎস্য খামার সেখানকার সবটাই নিজের কেনা জমি। এত জমি কীভাবে একসঙ্গে কিনতে পেলেন এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এগুলো তো ধানি জমি ছিল। ফলে ভালো দাম দেওয়ায় যে কৃষকরা চর আবাদ করেছিলেন, তারা সেগুলো তার কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। এই জমিগুলোর এক টুকরোও খাস নয় দাবি করে তিনি বলেন, ‘নিয়মিত আমার জমির খাজনা পরিশোধ করে যাচ্ছি আমি।’

গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুর রশিদ কিরণের আটটি প্রকল্প আছে চরমজিদ এলাকায়। এসব প্রকল্পের সব জমিই সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত। মামুনুর রশিদ কিরণ অবশ্য তার দখলে থাকা খাস জমির পরিমাণ ২০০ একর বলে জানান। তার দাবি, এর বাইরে তার মালিকানাধীন কিছু জমি আছে।

তিনি বলেন, ‘পুরো জমিতে গাছ লাগানো, মাছ চাষ এবং ধান, সয়াবিন, সূর্যমুখী রোপণ করেছি। ২০০ একর জমির মধ্যে প্রতি মাসে মৎস্য প্রকল্পের জন্য একরপ্রতি দেড় হাজার টাকা ও কৃষি জমির জন্য ৬০০ টাকা সরকারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিতে হয়।’ সরকার ক্ষতিপূরণ নিচ্ছে কিন্তু বন্দোবস্ত দিচ্ছে না এমন আক্ষেপ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তবে আমার জমি আমি বন্দোবস্ত পেয়ে যাব বলে আশা করছি।’ খাস জমি দখল করা আইনের লঙ্ঘন কি-না এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমার এ জমি সরকারের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক জোনের আওতায় পড়েনি।

তাছাড়া সরকার যখন চিংড়ি মহাল ঘোষণা করেছিল, তখন আমি ভূমিহীনদের কাছ থেকে উপযুক্ত মূল্যে এ জায়গা কিনে নিয়েছি। এখনও সরকারকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে যাচ্ছি।’

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের আমলে প্রথমে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী এবং পরে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বাণিজ্য উপদেষ্টা থাকাকালে বরকত উল্লাহ বুলু সলজিত ডেইরি প্রতিষ্ঠা করেন। মামুনুর রশিদ কিরণ তার জমির পরিমাণ ২০০ একরের মতো দাবি করলেও ২০০৫ সালের অক্টোবরে ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. মর্ত্তুজা হোসেন মুন্সির নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি সুবর্ণচর বিষয়ে যে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন, ওই প্রতিবেদনে মামুনুর রশিদ কিরণের গ্লোব ফিশারিজের দখলে ৪০০ একর এবং নোয়াখালীর বিশিষ্ট শিল্পপতি আনোয়ার মীর্জা প্রতিষ্ঠিত আল আমীন গ্রুপের দখলে ৫০০ একর জমিতে পুকুর খনন করে মাছ চাষ এবং ফলদ, বনজ বৃক্ষসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

আনোয়ার মীর্জার ভাই শামীম মীর্জার আল-বারাকা অ্যাগ্রো ফিশারিজের দখলে রয়েছে শতাধিক একর জমি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই জমি তারা ১৯৭২ ও ১৯৮৬ সালে বন্দোবস্তপ্রাপ্ত ভূমিহীনদের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে অর্জন করেছেন। তাদের দখলে রাখা এ বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ ৯৮/৭২ এবং ভূমি সংস্কার অধ্যাদেশ ৮৪ অনুযায়ী জমির সর্বোচ্চ সীমা লঙ্ঘন। বন্দোবস্তপ্রাপ্ত ভূমি ক্রয়-বিক্রয় কিংবা হস্তান্তরযোগ্য নয়। খাস জমির সুষ্ঠু বন্দোবস্তের জন্য ১৯৯৭ সালে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে সরকার। কৃষি খাস জমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্তের ওই নীতিমালা অনুযায়ী, শুধু ভূমিহীন পরিবারই খাস জমি বরাদ্দ পাওয়ার অধিকারী।

ভূমিহীনের ভূমিতে আরও সব ভূস্বামী : ১৯৯৭ সালের নীতিমালায় ভূমিহীন বলতে কৃষির ওপর নির্ভরশীল কৃষিজমিহীন পরিবারকে বোঝানো হয়েছে। এই ভূমিহীনদের ভূমি কিনে ভূস্বামী হয়েছেন চরাঞ্চলের দখলদাররা। এই প্রক্রিয়ায় চরনোমান ও চরবায়েজিদ এলাকায় ২০৭ একর জমি কিনে ঢাকা-নিউইয়র্ক অ্যাগ্রো ফিশারিজ নাম দিয়ে মাছের চাষ করছেন খন্দকার রুহুল আমিন।

তিনি আওয়ামী লীগের নোয়াখালী জেলা শাখার সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সদস্য মোহাম্মদ হানিফের বেয়াই। আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের এ সদস্য নিজেও চরনোমানে ৫০ একর জমি দখল করে গড়া রাসেল অ্যাগ্রো ফিশারিজের মালিক। অবশ্য মোহাম্মদ হানিফের দাবি, রাসেল অ্যাগ্রো ফিশারিজের মালিক তিনি নন, তার ছেলে। খন্দকার রুহুল আমিন তার ছোট ছেলের শ্বশুর, কিন্তু খন্দকার রুহুল আমিনের ফিশারিজের সঙ্গে তিনি বা তার পরিবারের কেউ জড়িত নেই।

তারা কীভাবে চরের জমির মালিক হলেন তা জানতে চাওয়া হলে মোহাম্মদ হানিফ বলেন, সাধারণত চর জাগার পর ভূমিহীনরা গিয়ে আবাস গড়ে। বিভিন্ন প্রকল্পের উদ্যোক্তারা মূলত ওই ভূমিহীনদের দখলে থাকা জমির দখলস্বত্ব কিনে নেন। এটা তো বৈধ কোনো প্রক্রিয়া নয়, তবু তার ছেলে ও অন্য স্বজনরা জমি কিনছেন কেন এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘সবাই কিনছে, তাই ওরা কিনছে।’

তারেক রহমানের এক সময়ের ব্যবসায়িক সহযোগী আমিন আহমেদ ভূঞা ওরফে ডলার আমিনের দখলে আছে মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের চরআলাউদ্দিন এলাকার ৩০০ একর জমি। ২০০৩-০৪ সালে বিএনপির আমলে এ জমি দখলে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ডলার আমিন বলেন, ২০ বছর আগে আমার কেনা এ জমি জেগে ওঠা নতুন চরের খাস জমি নয়। খাস নয়, তবে একসঙ্গে এত জমি কীভাবে পেয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি নিয়মিত খাজনা দিচ্ছি। কে বলেছে এ জমি খাস তার নাম বলুন?

মহিউদ্দিন চৌধুরী চরআক্রাম উদ্দিনে ২০০০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৪০০ একর জমি দখলে নেন। তিনি সুবর্ণচরের মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হয়েছিলেন। চর দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমি ক্রয়সূত্রে এখানে ৭০ একর জমির মালিক। আমি বছর বছর জমি কিনে এই জমি করেছি।’ এক সময় প্রতি একর জমি পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকায় কেনা যেত বলেও জানান তিনি।

সরেজমিন অনুসন্ধানের সময় চরনোমানে মোশারেফ গ্রামার মৎস্য খামারের নামে ১৪০ একর, নুরু মিয়া মৎস্য খামারের নামে ১৩০ একর, চরআলাউদ্দিনে আজাদ অ্যাগ্রো ফিশারিজের নামে ১১২ একর এবং চরআক্রাম উদ্দিনে বাইতুশ সাইফ মৎস্য খামারের নামে ১৫২ দশমিক ৫৫ একর, মৈত্রী অ্যাগ্রো ফিশারিজের নামে ২৬৮ দশমিক ৮৭ একর, লাদেন নামে এক ব্যক্তির নামে ৪০০ একর জমি আছে বলেও স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেছে।

পিছিয়ে নেই ছাত্রলীগ নেতারাও : বড় ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি চর দখলে পিছিয়ে নেই ছাত্রলীগ নেতারাও। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, সুবর্ণচর উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক আমির খসরু চরআক্রাম উদ্দিনে ২০ একর জমি দখল করে এক ব্যক্তিকে দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছেন। তবে তিনি চর দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার নামে নতুন চরে এক ইঞ্চি খাস জমিও নেই।

এ বিষয়ে তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে আলাপের এক পর্যায়ে বলেন, ‘চরে রাজীব ভাই (উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি) ও আজাদের (ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক) জমি আছে।’ এ বিষয়ে উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাজীবকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, চরের খাস জমিতে নয়, তবে চরক্লার্কের আক্তার মিয়ার হাটের পাশে তার বাপ-দাদার সম্পত্তি আছে।

তিনি বলেন, খাস জমি তো দূরের কথা, চরে ১০ একর জমির পুরনো দলিল তার ঘরে পড়ে আছে। সেই জমি তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না। আর উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আজাদ বলেন, চরআক্রামউদ্দিনে শাহজাহান মাস্টার নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি ১২ একর জমি কিনেছেন, তবে এই জমি খাস নয়। তিনি যে জমি কিনেছেন সে জমি বয়ার (নদী ভাঙনের পর পয়স্তিতে আবার জেগে ওঠা) জমি। কামরুল ইসলাম নামে ছাত্রলীগের আরেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়কের বিরুদ্ধে ১৫ একর জমির দখলের অভিযোগ থাকলেও তিনি তা অস্বীকার করেন।

ভূমিহীন ছাড়া বন্দোবস্তের সুযোগ নেই : সুবর্ণচর উপজেলা প্রশাসন জেগে ওঠা নতুন চরের কত একর বেদখল হয়ে গেছে তার সঠিক পরিসংখ্যান দিতে পারেনি। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, অর্থনৈতিক জোন হিসেবে প্রস্তাবিত মোট জমির মধ্যে ১১ হাজার ৫৪ দশমিক ৬৭ একর চিংড়ি মহালের নামে দখল হয়ে গেছে। এ নিয়ে বেশ ক’টি মামলা ঝুলছে উচ্চ আদালতে। আইনগত জটিলতা শেষ না হলে এ জমি দখলদারদের কাছ থেকে মুক্ত করা যাচ্ছে না।

গত কয়েক বছরে জেগে ওঠা নতুন চরের জমি মাস ছয়েকের মধ্যে চর উন্নয়ন ও বসতি স্থাপন প্রকল্পের (সিডিএসপি) মাধ্যমে প্রকৃত ভূমিহীনদের মধ্যে বন্দোবস্তের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানালেন তিনি। নোয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবদুর রব মণ্ডল বলেন, নতুন চরগুলোতে সিডিএসপির চতুর্থ ধাপের মাধ্যমে এখনও ভূমিহীনদের জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হচ্ছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে এই প্রকল্পের পঞ্চম ধাপের কাজ শুরু হবে। চরাঞ্চলে জেগে ওঠা জমি ভূমিহীন ছাড়া অন্য কাউকে বন্দোবস্ত দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

চরের মানুষের উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত একটি প্রকল্পের নাম সিডিএসপি। এই প্রকল্পের ডেপুটি টিম লিডার বজলুল করিম জানান, এতে সরকারের ভূমি, স্থানীয় সরকার, পানি উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি, বন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলসহ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক, এসডিআই, ডিওএস ও সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা যুক্ত রয়েছে। প্রকল্পের অর্থায়ন করছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অর্থ উন্নয়ন তহবিল ইফাদ, নেদারল্যান্ডস ও বাংলাদেশ সরকার। সূত্র: সমকাল

Comments

comments