১৬ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং, ২রা পৌষ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২৮শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯ হিজরী

বাংলাদেশের ৩৬৫৬ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির দ্বিতীয় বাড়ি মালয়েশিয়ায়! কিভাবে?

নভেম্বর ২৮, ২০১৭, সময় ৬:৫৬ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের তিন হাজার ৬৫৬ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি দ্বিতীয় বাড়ি কিনেছেন মালয়েশিয়ায়। গত ১৪ বছরে ওই ব্যক্তিরা এ বাড়ি কেনেন। তাঁদের মধ্যে এ বছরই সেখানে দ্বিতীয় বাড়ি করেছেন ১৬৩ জন বাংলাদেশি। মালয়েশিয়ায় দ্বিতীয় বাড়ি কেনা বাংলাদেশিদের বিষয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুদক সূত্রে জানা যায়, এই তালিকার মধ্যে সাবেক দুই সংসদ সদস্য (এমপি), সাবেক এক বিচারক, সাবেক এক সচিব, বর্তমান সরকারের এক মন্ত্রীর ছেলে, বারভিডার সাবেক এক চেয়ারম্যান, চাঁদপুর জেলা বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের এক নেতা, বিএনপির সাবেক এক মন্ত্রী, সাবেক এক অর্থ মন্ত্রীর ছেলে, ফেনীর সরকারদলীয় এক এমপি, বিএনপির বাগেরহাটের সাবেক এক এমপি, বেসিক ব্যাংকের সাবেক সিনিয়র পদমর্যাদার এক কর্মকর্তার নাম রয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশিদের কেউ কেউ ব্যবসায়িক কারণে মালয়েশিয়ায় অবস্থানের জন্য দ্বিতীয় আবাস গড়েছেন। আবার অনেকে অবৈধভাবে অর্থপাচার করে সেখানে বাড়ি কিনেছেন, যা দেশের প্রচলিত আইনে অপরাধ। এভাবে অর্থ পাচার করে বাড়ি কেনা ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী।

২০০২ সালে মালয়েশিয়ায় মাই সেকেন্ড হোম (এমএম২এইচ) প্রকল্পটি চালু হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন দেশ থেকে এখন পর্যন্ত ৩৪ হাজার ৫৯১ জন অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে শীর্ষ স্থানে চীনের ৯ হাজার ২৮৩ জন মালয়েশিয়ায় বাড়ি কিনেছেন। দ্বিতীয় স্থানে থাকা জাপানের ৪ হাজার ৩০৩ জন এই সুবিধা নিয়েছেন।

আর তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশিরা। এ ছাড়া আয়ারল্যান্ডের ২ হাজার ৪৬৫, কোরিয়ার ১ হাজার ৪০৪, ইরানের ১ হাজার ৩৪১, সিঙ্গাপুরের ১ হাজার ৩২৫, তাইওয়ানের ১ হাজার ২৩৯, পাকিস্তানের ৯৮৩ ও ভারতের ৯১৫ জন এ প্রকল্পে অংশ নিয়েছেন। এই কর্মসূচিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিয়ে যেকোনো দেশের নাগরিক মালয়েশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন।

এতে বিনিয়োগকারীদের আয়ের উৎস গোপন রাখে দেশটি। পাঁচ লাখ রিঙ্গিত বা ১ কোটি ২২ লাখ টাকা জমা দেয়ার পাশাপাশি মাসিক ১০ হাজার রিঙ্গিত বা মাসে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা বৈদেশিক আয় দেখাতে পারলেই পাওয়া যায় মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমে বসবাসের সুযোগ।

মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোম (এমএম২এইচ)-এর ওয়েব সাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সাল থেকে বাংলাদেশিরা এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ শুরু করে। ওই বছর মাত্র ৩২ জন বাংলাদেশি এতে অংশ নেয়। ২০০৪ সালে ২০৪, ২০০৫ সালে ৮৫২, ২০০৬ সালে ৩৪১, ২০০৭ সালে ১৪৯, ২০০৮ সালে ৬৮, ২০০৯ সালে ৮৬, ২০১০ সালে ৭৪, ২০১১ সালে ২৭৬, ২০১২ সালে ৩৮৮, ২০১৩ সালে ২৮৫, ২০১৪ সালে ২৫০, ২০১৫ সালে ২০৫, ২০১৬ সালে ২৮৩ ও ২০১৭ সালের জুন মাস পর্যন্ত ১৬৩ জনসহ মোট ৩ হাজার ৬৫৬ বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় বাড়ি ক্রয় করেছেন।

দ্বিতীয় আবাস প্রকল্পে অংশ নেওয়া বাংলাদেশিদের বিষয়ে এরই মধ্যে তদন্ত শুরু করেছে দুদক। অর্থ পাচার করে বাড়ি কিনেছেন এমন সন্দেহভাজনদের একটি তালিকা করে তাঁদের বিষয়ে তদন্ত করতে একটি কমিটি করেছে দুদক। তদন্তের আওতায় আসা ব্যক্তির সংখ্যা এক হাজারেরও বেশি। তদন্তে অর্থ পাচারের বিষয় প্রমাণ হলে তাঁদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মালয়েশিয়ায় যাতায়াতকারী ১০ হাজার ৯০৪ জনের তালিকা সংগ্রহ করেছে দুদক। এ তালিকা যাচাই-বাছাই করে দ্বিতীয় বাড়ি প্রকল্পে অর্থ পাচার করতে পারেন এমন সন্দেহভাজন এক হাজার ৫০ জনকে চিহ্নিত করা হয়। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত আরো ১৩ জনের তালিকা সংগ্রহ করেছে দুদক।

ওই তালিকায় নাম আসাদের মধ্যে ৬৪৮ জনের বিরুদ্ধে পাঁচ হাজার কোটি টাকা পাচারের প্রাথমিক প্রমাণও পাওয়া গেছে। আবার এদের মধ্য থেকে প্রাথমিকভাবে যাচাই-বাছাই করে ২০ জনের একটি তালিকা নিয়ে পুরোদমে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি বিরোধী সংস্থাটি।

দুদক সূত্র জানায়, আবাসিক ভিসা নিয়ে বছরের পর ধরে মালয়েশিয়ায় আসা-যাওয়া করেন এমন ব্যক্তিদের তালিকা যাচাই-বাছাই ও তথ্য সংগ্রহে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে রয়েছেন দুদকের উপ-পরিচালক মো. জুলফিকার আলী, সহকারী পরিচালক মো. সালাহউদ্দিন ও উপ-সহকারী পরিচালক সরদার মঞ্জুর আহমেদ।

ওই কমিটির সদস্যরা ইতিমধ্যে এক হাজার ৫০ জনের স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা, পাসপোর্টের ধরন ও সাংকেতিক বর্ণমালার ব্যাখ্যাসহ তথ্য প্রদানের জন্য দুদক থেকে পাসপোর্ট অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েছেন। ওই চিঠিতে মালয়েশিয়ায় দ্বিতীয় বাড়ি গড়ার নামে অর্থ পাচারের অভিযোগ উল্লেখ করে সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে রেকর্ডপত্র ও তথ্যাদি পর্যালোচনা বিশেষভাবে প্রয়োজন উল্লেখ করা হয়। চিঠির সঙ্গে এক হাজার ৫০ জনের নাম ও তাঁদের পাসপোর্ট নম্বর উল্লেখ করে আলাদা একটি তালিকা পাসপোর্ট অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। কিছু তথ্য চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছেও একটি চিঠি দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র শুভংকর সাহা বলেন, অনেকে মালয়েশিয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য করে সেখানে বাড়ি তৈরি করে। সে বিষয়ে তেমন কিছু করার নাই। তবে দেশের টাকা দিয়ে যদি কেউ দেশের বাইরে বাড়ি করে তবে সেটি মানি লন্ডারিংয়ের শামিল। তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) তদারকি করে থাকে।

দুদকের মহাপরিচালক মো. মাইদুল ইসলাম বলেন, মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে এখন পর্যন্ত কারো বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। তবে কমিশনের একটি তদন্ত দল এসব বিষয়ে তদন্ত করছে।

Comments

comments