১৬ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং, ২রা পৌষ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২৮শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯ হিজরী

ইউটিউবে খ্যাত বাংলা গানের ঢল!

ডিসেম্বর ৬, ২০১৭, সময় ৬:৩১ অপরাহ্ণ

সত্তর-আশির দশককে বলা হয় বাংলাদেশের গানের স্বর্ণযুগ। এই সময়ে চলচ্চিত্রের গান ধারাবাহিকভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। বিশেষ করে অসাধারণ সব কথা, আবেগ জড়ানো সুর ও গোছানো সংগীতায়োজন এবং সর্বশেষ অনবদ্য গায়কির মাধ্যমে গানগুলো শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যেত। সেই গানগুলো কালজয়ী হয়ে এত বছর পরও শ্রোতাদের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে। এখনকার তরুণ শ্রোতাদের মুখে মুখেও ঘুরেফিরে আসে সেই সব গান। সত্তর ও আশির পর নব্বইয়ের দশকেও অডিও অঙ্গন ইতিহাস রচনা করে। সিনেমার গানে সেই সময় অনেকটা ভাটা পড়লেও বিভিন্ন শিল্পী ও ব্যান্ডের অ্যালবামের গানে তারুণ্য ভেসেছে অন্যরকম জোয়ারে। মেলোডি ও সফট রক প্যাটার্নের অসংখ্য গান শ্রোতাপ্রিয়তা লাভ করে। শূন্য দশকের শুরু থেকে ২০০৪ পর্যন্ত ফিতার ক্যাসেটে গানের সেই আবেদনটা ছিল। কিন্তু তার পর থেকেই ঘটে সিডি যুগের আবির্ভাব। আর এখন সিডি মাধ্যমও বিলুপ্ত প্রায়। গান প্রকাশ হচ্ছে ডিজিটালি। ইউটিউব হয়ে উঠেছে গান শোনার সব থেকে জনপ্রিয় ও বড় মাধ্যম। অন্যদিকে প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে অতি প্রযুক্তি ভর করতে থাকে সংগীতাঙ্গনে। অটো টিউনের মাধ্যমে বেসুরোদের আবির্ভাব ও প্রভাব সৃষ্টি হতে থাকে। মোটা সম্মানীর বিনিময়ে জনপ্রিয় কম্পোজারের মাধ্যমে গান তৈরি ও বিলাসবহুল মিউজিক ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে বিলাসী শিল্পীরাও ‘কণ্ঠশিল্পী’ তকমাটা জড়িয়ে নেয় নামের পাশে। পাশাপাশি সুরের ক্ষেত্রেও একঘেয়েমি একটা ব্যাপার চলে আসে। এখনতো শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই হাজার হাজার হোমস্টুডিও ও সংগীত পরিচালক রয়েছে। যারা বাসায় কম্পিউটার সেটআপ, কিবোর্ড ও লুপ নিয়ে বসে যাচ্ছেন গান তৈরিতে। সেগুলো আদৌ গান হচ্ছে কিনা সেই নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আর তাইতো গান এর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মানহীন গানে ছেয়ে গেছে চারদিক। ইউটিউবে যে যার মতো করে গান প্রকাশ করছে। যার ফলে এ মাধ্যমটিতে মানহীন গানের জোয়ারে মানসম্পন্ন গান খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০০৩ সালে হাবিব ওয়াহিদ তার ‘কৃষ্ণ’ অ্যালবামের মাধ্যমে সংগীতে একটি নতুন ধারার সূচনা করেছিলেন তবে তার পরবর্তী বেশির ভাগ সংগীত পরিচালক হাবিবকে অনুসরণ করতে গিয়ে একই ধারার সুর-সংগীতের গান তৈরি করতে থাকেন। সাময়িক জনপ্রিয়তাও হাসিল করেন। কিন্তু অতি প্রযুক্তির ব্যবহার, একঘেয়েমি সুর, লুপের ব্যবহার, অটোটিউনের আধিক্যর কারণে হারিয়ে যাওয়ার পথে অ্যাকুস্টিকনির্ভর সংগীত। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে নকল সুরের গান তৈরির মহোৎসব। তবে এর মধ্যেও অনেক তরুণই ভালো কাজও করছেন। যারা মৌলিক কথা-সুর-সংগীতের মাধ্যমে গানের প্রতি ভালোবাসা থেকে কাজ করছেন তাদের টিকে থাকতে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে। এ বিষয়ে দেশবরেণ্য সুরকার-সংগীত পরিচালক আলাউদ্দিন আলী বলেন, মানহীন গানতো হবেই। কারণ, এখন শিক্ষা ও চর্চার বড় বেশি অভাব। যে ক্ষেত্রটিতে কাজ করবে তার সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে। আমি ২৫ বছর সহকারী হিসেবে কাজ করছি। তার আগে দীর্ঘদিন বাজিয়েছি। তারপর পূর্ণাঙ্গ সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করি। এখন যারা গান লিখেন তাদের বেশির ভাগই কবিতা পড়েন না, বই পড়েন না, চর্চাটা নেই। সুরকার-সংগীত পরিচালকদের যন্ত্র, রাগসহ বিভিন্ন বিষয়ে কোনো অভিজ্ঞতা নেই। অথচ পরিপূর্ণ অভিজ্ঞতা এক্ষেত্রে দরকার। সুরকারদের বিভিন্ন ধরনের গান করতে হয়। দেখা গেল সিনেমায় একটি সকালের দৃশ্য দেখানো হবে। সকালের রাগ জানা না থাকলে সেটার সংগীত করা সম্ভব নয়। যারা গান লিখছেন, সুর করছেন, সংগীত করছেন, গাইছেন তাদের অবশ্যই শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। এর পাশাপাশি চটজলদি জনপ্রিয় হওয়ার ইচ্ছা, অ্যাকুস্টিকের অভাব প্রভৃতি বিষয়তো রয়েছেই গান দীর্ঘস্থায়ী না হওয়ার পেছনে। কিংবদন্তি গীতিকবি মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান এ বিষয়ে বলেন, বাংলা গানের মান আর আগের জায়গায় নেই। প্রযুক্তিগতভাবে আমরা এগিয়েছি। কিন্তু গানের আবেদনের দিক থেকে আমরা পিছিয়েছি ক্রমাগত। এখন তাল বৈচিত্র্য নেই। দোলা নেই। একই রকমের দোলায় সব গান হচ্ছে। যার কারণে একঘেয়েমি ব্যাপারটা চলে আসছে। একটি অ্যালবামের ১০টি গান শুনলে একটিও মনে থাকে না। কারণ, তাল বৈচিত্র্য না থাকলে সে গান দাঁড়াতে পারে না। দ্বিতীয়ত, অনেকে এখন খুব ভালো গান  লিখছে। কিন্তু সুরের কারণে এক মাত্রার গান লিখতে হচ্ছে তাদের। ফলে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছেন তারা। অনেকে আবার গড়পড়তা লিখছেন। তাদের বেশির ভাগ গানের কথা অনেক দুর্বল। অনেকের ছন্দ ঠিক থাকে না। গভীরতা নেই গানের কথায়। সুরের জন্য শব্দ বসিয়ে দেয়া হচ্ছে। কথা-সুরের সমান প্রাধান্য থাকতে হবে গানে। আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে, যন্ত্র সংগীতের অতি ব্যবহার হচ্ছে। যার ফলে গানটা শ্রোতার মনে থাকছে না। এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন হলেই কিন্তু গান দাঁড়াবে।

Comments

comments