১৯শে জানুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৬ই মাঘ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২রা জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৩৯ হিজরী

যেভাবে বিপিএলে স্পট ফিক্সিং হয়!

ডিসেম্বর ১৭, ২০১৭, সময় ৬:৩৭ পূর্বাহ্ণ

চলমান অ্যাশেজ সিরিজে স্পট ফিক্সিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। ঐতিহাসিক সিরিজটি এমন অপবাদের অভিযোগে দুষ্ট হওয়ার পর বিশ্ব ক্রিকেটাঙ্গনে উঠেছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। এর মধ্যেই ফিক্সিং আগুনে ঘি ঢেলে দিলেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক পেসার ডার্ক ন্যানেস। তিনি দাবি করলেন, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) বেশ কিছু ম্যাচে ফিক্সিং হয়!

ওই আসরে বিলুপ্ত সিলেট রয়্যালসের হয়ে খেলেন ন্যানেস। ফ্র্যাঞ্চাইজিটির হয়ে খেলা কয়েকটি ম্যাচের কিছু মুহূর্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি, ‘বিপিএলে কয়েকটি ম্যাচে কিছু মুহূর্ত নিয়ে আমি সন্দিহান। যেমন ধরেন, ম্যাচ শুরুর আগে প্রথমে মালিকেরা মাঠে ঢুকে পড়তেন। যদিও ওই মুহূর্তে তাদের মাঠে প্রবেশের অনুমতি নেই। পরে মালিকের সঙ্গে দেখা করতেন টিম ম্যানেজার। তিনি মালিককে জিজ্ঞেস করতেন, এখন কী করব? পরে কোচের কাছে যেতেন। তাদের এমন চলাফেরা থামাতে নিরাপত্তাকর্মীদের নাভিশ্বাস উঠে যেত। মালিকেরা সবসময় নিজের কাছে মোবাইল ফোন রাখতেন। তারা সবসময় কোচের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।’
পার্থে চলছে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের অ্যাশেজ সিরিজের তৃতীয় টেস্ট। এতে ধারাভাষ্যকার হিসেবে কাজ করছে ন্যানেস। ওয়াকার গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘বিপিএলের ওই আসরে গ্যালারিতে দর্শক সারিতে থাকতেন বাজিকররা। তাদের শার্টের হাতায় থাকত মাইক্রোফোন। কোমরে থাকত ১০টির মতো মোবাইল ফোন। ম্যাচে কিছু ঘটলেই মাইক্রোফোনে তারা কথা বলত। যা ইচ্ছা তা-ই করত।’

শুধু বিপিএল নয়, আইপিএলেও স্পট ফিক্সিং হয় বলে জানান ৪১ বছরের বাঁহাতি পেসার।

২০১৩-বিপিএল আসরে স্পট ফিক্সিংয়ের কথা স্বীকার করেন বাংলাদেশের লিটল মাস্টার মোহাম্মদ আশরাফুল। পরে তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিষিদ্ধ হন।

ফিক্সিং কলঙ্কে অ্যাশেজ!

ফিক্সিং কথাটি শুনলেই চোখের সামনে ভাসবে একটি দলের নাম। যাদের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে এ কাণ্ডটি। পাঠক এতক্ষণে হয়ত বুঝতে পেরেছেন কার কথা বলা হচ্ছে। হ্যাঁ দলটি পাকিস্তান। বিশ্ব ক্রিকেটে ফিক্সিং কাণ্ডে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেটের। শাস্তি পেয়েছেন অনেক ক্রিকেটার।এখনো শাস্তিতে আছেন জাতীয় দলের অনেকে। এবার ফিক্সিং কাণ্ডে যার নাম জড়িয়েছে তা শুনলে আপনি নিজেই ভড়কে যাবেন!
ক্রিকেটের সবচেয়ে সম্মানের টেস্ট সিরিজ অ্যাশেজেও ম্যাচ ফিক্সিংয়ের কালো ছায়া পড়েছে বলে জানিয়েছে ইংলিশ গণমাধ্যম। ইংল্যান্ড ভিত্তিক গণমাধ্যম দ্য সানের দাবি অস্ট্রেলিয়া বনাম ইংল্যান্ডের এই সিরিজেও হয় স্পট ফিক্সিং, ম্যাচ ফিক্সিংয়ের মতো ঘটনা। বুকিরা নিজেরাই স্বীকার করে নিয়েছে ঠিক কিভাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের সাহায্য নিয়ে চলে এই বেটিং দুনিয়া।

দ্য সানের প্রতিবেদনে ফের বোমা ক্রিকেট দুনিয়া। ভারত-পাকিস্তানের গণ্ডি অতিক্রম করে বেটিং দুনিয়া গ্রাস করেছে নিয়েছে বিশ্ব ক্রিকেটকে তাই প্রমাণ করার জন্য চার মাস ধরে স্টিং অপারেশন চালিয়েছে এই আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম। বুকিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় যারা, জানিয়ে দেয় তাদের কাছে এমন তথ্য থাকে যা দিয়ে লাখ লাখ পাউন্ড যেতা সম্ভব।
দ্য সান’র পরিচালিত স্টিং অপারেশন নিজেদের রিপোর্টও জমা দিয়েছে আইসিসি ও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে।
যদিও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এখনও পর্যন্ত টেস্ট যা দেখেছি বা পার্থ টেস্ট নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
তাদের তরফ থেকে আরো জানানো হয়েছে এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই, কোনো প্রমাণ নেই। আইসিসি বা ম্যাচ রেফারিদের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ জানানো হয়নি।

এদিকে আইসিসি’র পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে তারা পুরো অভিযোগ খতিয়ে দেখবে। তাদের দুর্নীতি দমন শাখার সঙ্গে পুরো বিষয়টি নিয়ে কথা বলবে। তদন্তে প্রাপ্ত জিনিস সব পাওয়া গেছে। প্রাথমিক দেখায় কিছু প্রমাণ বলে মনে হয়নি। কিন্তু তারপরও আরো গভীরভাবে দেখা হচ্ছে।
দ্য সানের অনুসন্ধানে দুইজন ভারতীয় ফিক্সার বেরিয়ে আসেন। সোবার্স জোবান একজন প্রাক্তন ক্রিকেটার, যিনি ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলেছেন। বিরাট কোহলির সঙ্গে দিল্লিতে একসময় ক্রিকেট খেলতেন তিনি।
অন্যজন বুকমেকার ও ব্যবসায়ী প্রিয়ঙ্ক সাক্সেনা। তামাক ও মশলার বিক্রেতা প্রিয়ঙ্ক এমনটাই জানিয়েছেন তার পার্টনার জোবান। জোবানের মাধ্যমে দুর্নীতিগ্রস্ত ক্রিকেটারদের দলে নিয়ে কাজ করেন তিনি।
এক ওভারে কত রান হবে এটা নির্ধারণ করার জন্য ১ লাখ ৪০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত টাকা ব্যয় করা হয়। বুকিদের মধ্যে একজনকে ‘বিগ’ নামে চিহ্নিতকরণ করা হয়েছে।

তিনি জানিয়েছেন, কোনো একটি ওভারের আগে আমি আপনাকে বলব এই ওভারে এত রান হবে, তারপর টাকা লাগাতে হয়।
তার বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি প্লেয়ারদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আছে। যে ওভারে তিনি নিজের নির্ধারিত রানটা করবেন তার আগে কোনো সিগন্যাল পাঠান। সেটা হতে পারে এক হাত থেকে গ্লাভস খুলে আবার গ্লাভস পড়া। মাঠে দর্শকদের মধ্যে বুকিদের প্রতিনিধি থাকে। তিনি বেটিং মার্কেটে খবরটা পাঠিয়ে দেন।
বুকিদের অকপট স্বীকারোক্তি প্লেয়াররা আসলে তাদের ‘পাপেট’। অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলে তাদের একজন রয়েছেন, যার কোড নাম ‘সাইলেন্ট ম্যান’। বুকিদের পক্ষ থেকে এও জানানো হয়েছে, বিশ্বকাপ জয়ী একজন অলরাউন্ডারসহ বর্তমান ও প্রাক্তন দলের বহু ক্রিকেটারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আছে।
তৃতীয় অ্যাশেজ টেস্টের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ জোবানের দাবি, ছক অনুযায়ী কাজ হলে এই টেস্ট পাঁচদিন গড়াবে।
তিনি বলেন, খেলোয়াড়দের নিজের বুকি ও এজেন্ট আছে। আইপিএল সবাইকে শিখিয়েছে ঠিক কী করে এটা সহজে করা যায়।

গত দশবছরে জোবান বহু দক্ষিণ আফ্রিকার, অস্ট্রেলিয়ার ও পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। যারা অর্থ উপার্জন করতে চায় এবং সুরক্ষিত থাকতে চায়। কোনো একজন টেস্ট প্লেয়ার একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ওয়াইড বল করার জন্য ১ কোটি ৫২ লাখ টাকা পেয়েছে। আবার কেউ ওভারের শেষ বলে আউট হয়ে যাবার জন্যও টাকা পায়।
জোবান আরো বলেন, সিগন্যাল পাঠানোর হাজার ধরণ আছে। তার মতে ক্যামেরায় ধরা পড়বে এমন সিগন্যাল আর পাঠায় না ক্রিকেটাররা। আইপিএলে এত বেশি ক্যামেরা থাকে। তাই এখন অন্য পদ্ধতিতে সিগন্যাল হয়। একজন ক্রিকেটারের পাঁচটা হাফ স্লিভ ও পাঁচটা ফুল স্লিভ শার্ট আছে।
তিনি বলেন, ফুল স্লিভ টি-শার্ট পড়ে বল করতে এলেন এটা একটা সিগন্যাল। আবার কেউ তার দিকে আসা বলটা আটাকালো না, নো বল করল এ সবই সিগন্যালের মধ্যে পড়ে। একজন ক্রিকেটার সিগন্যাল দেয়ার পর ২-৩ মিনিটের জন্য ফোন লাইন খুলে যায়।

Comments

comments

আজকের সব খবর

error: Content is protected !!